গরুর দুধ বেচে জীবনযুদ্ধে জয়ী বিরামপুরে প্রতিবন্ধী ইকবাল

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আব্দুর রাজ্জাক, বিশেষ প্রতিনিধি– পরনির্ভরশীল না হয়ে প্রতিবন্ধী ইকবাল হোসেন নিজেকে স্বপ্ন দেখেন নিরন্তর পথচলার। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যে সমাজের প্রতিটি উন্নয়ন কাজে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন, তাকে না দেখলে বোঝায় যাবেনা। তাঁর জন্ম থেকে দুই পায়ের গোড়ালি বাঁকানো, স্বাভাবিক হাঁটতে পারেন না। ভারী কোন কাজ করতে অসামর্থ্য। গরুর দুধ বেচে সংসার চালানোয় এলাকার মানুষের কাছে সে রোল মডেল।

দারিদ্র্য ঘোঁচাতে বিরামপুর উপজেলা সমাজসেবা দপ্তর থেকে ২০০৬ সালে নিয়েছিলেন ১০ হাজার টাকার ঋণ। কিনেছিলেন দেশীয়জাতের একটি গরু। লালন পালন করে বাড়তে থাকে আরও গরুর সংখ্যা। ৪ টি বাছুর বড় হলে সবমিলিয়ে বিক্রি করে ৮০ হাজার হাজার টাকা দাম পান। ইকবাল হোসেন দিনাজপুরের বিরামপুর পৌরশহরের উপকন্ঠে দোশরা পলাশবাড়ী মহল্লার মৃত ইসাহাক আলির ছেলে। প্রতিবন্ধী হলেও ইকবাল হোসেন গরু পালন করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা সবার কাছে অনুকরণীয়।

পরে উপজেলা সমাজসেবা দপ্তর থেকে আরও ১০ হাজার টাকা ঋণ নেয়াসহ ২০১৭ সালে দুটি এনজিও থেকে আরও ৮০ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে পাবনার সুজানগর থেকে লাল বাছুর সহ একটি ফ্রিজিয়ান গাভী কেনেন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায়। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। দুধ দোহন করতেন দৈনিক ২৪ লিটার করে। সেসময় প্রতি লিটার দুধের দাম ৩৫ টাকা। তাঁর গরু পালনের মাধ্যমে সংসার চালানো দেখে এলাকায় অনেকেই উদ্বুদ্ধ হয়ে বাড়িতে খামার করেছেন। সংসারের অসচ্ছলতা ও দারিদ্র্যের জন্য সৎ পরিশ্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। নিজের চেষ্টা, অধ্যাবসায়ের মধ্য দিয়ে আজও সংগ্রাম করেই পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করছেন।

সময় বদলে যায় তার সাথে বদলে যেতে থাকে ইকবাল হোসেনের চিন্তা ভাবনা। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁর গোয়ালঘরে গরুর সংখ্যা। বর্তমানে ফ্রিজিয়ান ৪ টা এবং শাহীয়াল জাতের ২ টা সহ এখন মোট ৬ টা গরু তার গোয়ালঘরে। সবমিলিয়ে দৈনিক প্রায় ৫০ লিটার দুধ দোহন করছেন এবং স্থানীয় খোলা বাজারে লিটার প্রতি ৪০ টাকা দরে দুধ বেচতেছেন। এছাড়াও বাচ্চা ও বুড়ানি ছাগল মোট ৭ টা। এসবমিলিয়ে তাঁর বাড়িতে সেই ছোট্র গোয়ালঘরটা এখন রূপান্তর হয়েছে একটা খামারে। ২৪ ঘণ্টা পরিচর্যা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের কারণে গরু, ছাগলগুলি বেশ হৃষ্টপুষ্ট। কারো কাছে দ্বারস্থ না হয়ে নিজের পরিশ্রমকে সম্বল করে সংসারের ভরণপোষণের জন্য জীবনযুদ্ধে প্রতিবন্ধী ইকবাল নিজের খামারেই করছেন আত্মনিয়োগ।

ইকবাল হোসেনের বড় ভাই ১৯৯৬ সালে বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করেন এবং বার্ধক্যজনিত কারনে ২০০০ সালে পিতা মৃত্যুবরণ করেন। বড় ভাইয়ের বজ্রপাতে মৃত্যুতে দাখিল পর্যন্তই পড়ালেখার ইতি টেনে হাল ধরেন সংসারের। ছোটবেলায় নানা স্বপ্নও বুনতেন। কিন্তু রাতে ঘুমানোর আগে দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার চিন্তায় ঘুম হতো না তার। এভাবেই চলে দীর্ঘদিন। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলতে থাকে তাঁর সংসার। বেঁচে থাকতে হলে স্বাবলম্বীতার বিকল্প নেই এই চিরন্তন সত্যকে বুকে ধারণ করে সদিচ্ছা, মেধা ও আত্মপ্রত্যয়কে পুঁজি করে তাঁর এই পথচলা। প্রতিবন্ধী ইকবাল হোসেনের উদ্যোগ ও একাগ্র চেষ্টার কারণেই গাভীর দুধ বেচার টাকায় ঘুরছে তাঁর সংসারের চাকা।

৪৮ বছর বয়সী এই ইকবালের সংসারে ৫ জন সদস্য। ২ ছেলে এবং ১ মেয়ে। ছোট ছেলে ৪র্থ শ্রেণি ও মেয়ে ৩য় শ্রেণিতে পড়ে। বড় ছেলের বয়স ১৭ বছর। প্রতিবন্ধী বাবার সাথে সর্বক্ষণ গরু ছাগলের পরিচর্যা, বাজারে দুধ বিক্রি এবং সাংসারিক কাজে সহায়তায় করেন। একারণে পড়ালেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত তাঁর বড় ছেলে।

ইকবাল হোসেন পজিটিভ বিডি নিউজ ২৪ ডটকমের বিশেষ প্রতিনিধি আব্দুর রাজ্জাককে বলেন, বাবা মারা যাবার পর পারিবারিক ওসিয়তি ৫ বিঘা ফসলি জমি দিয়েই চলতো সংসার। ২ ভাতিজাদের পড়ালেখার খরচের দায়িত্ব নিয়ে তাদেরকেও শিক্ষিত করেছি। ২০১৭ সালে পারিবারিক কারণে ওসিয়তি ৫ বিঘা ফসলি জমি থেকে বঞ্চিত হয়েছি। নিজের পরিশ্রমে কেনা মাথা গোঁজার অল্প পরিমাণের বসতভিটা ছাড়া আবাদি কোন নিজস্ব জমি নেই আমার। পশুপালনের উপর বিরামপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে দুইবার প্রশিক্ষণ নিয়েছি। গরুর কোন রোগবালাই হলে বা যেকোন পরামর্শ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তাদের থেকে নিয়ে থাকি। মোটাতাজাকরণের কোনো প্রকার ইঞ্জেকশন, রাসায়নিক সার ছাড়া সম্পূর্ণ দেশি খাবার দিয়েই গরুছাগল পালন করি। গরুর দুধ বেচে দৈনিক ২ হাজার টাকা পাই, তা থেকে খাদ্য হিসেবে কাঁচা সবুজ ঘাস, খড়, খৈল, ভাত, ভূষি প্রভৃতি বাবদ দৈনিক প্রায় দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ৪ বা ৫ শত টাকা দৈনিক টিকে, তা দিয়েই সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ সহ সংসারের ভরণপোষণ চলছে। আমার মোবাইল নম্বর ০১৭৯৬০৭৩২৩৬।

তিনি আরও বলেন, চলতি ২০২০ সালে এমপি শিবলী সাদিক মহোদয়ের বিশেষ বরাদ্দের প্রতিবন্ধী কার্ড পেয়েছি। জানতে পেরেছি বর্তমানে এমপি মহোদয় শারিরীকভাবে অসুস্থ, আমি তাঁর সুস্থতার জন্য দোয়া করছি।

বিরামপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাজুল ইসলাম বলেন, আমরা গরীব ও দুস্থ প্রতিবন্ধীদের স্বাবলম্বী করতে খামার, দোকান বা বিভিন্ন কর্মমুখী উদ্যোগের জন্য উপজেলা সমাজসেবা দপ্তর থেকে ঋণ প্রদান করে থাকি যাতে তারা পরনির্ভরশীল বা ভিক্ষাবৃত্তি পেশায় জড়িত না হয়।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*