দিনাজপুরের অনার্সে পড়ুয়া বিকাশ এখন ঢাকায় রিকশা চালায়

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোসলেম উদ্দিন,বিশেষ প্রতিনিধি : সংসারের অভাব-অনটন আর বাবা-মা,ভাই-বোনদের মুখে হাসি ফোটাতে ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছেন দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বাড়ি গ্রামের শ্রী তপন দাসের অনার্সে পড়ুয়া ছেলে শ্রী বিকাশ দাস। চাকরির সন্ধানে ঢাকা গিয়ে চাকরি না পাওয়ায়, শেষে পেটের দায়ে রিকশার পেন্ডেল ধরেছে বিকাশ।

২০১৩ সালে এসএসসি ও ২০১৫ সালে এইচএসসি পাশ করে বিকাশ বীরগঞ্জের স্কুল এবং কলেজ থেকে। সংসারে তার বড় ভাই, বড় বোন এবং ছোট রয়েছে। বড় ভাই প্রাণ কোম্পানিতে সেলসম্যান হিসেবে চাকরি করেন। অর্থের কারণে বড় বোনকে এখনও বিয়ে-শাদী দিতে পারেনি। বাবা কৃষক মানুষ, শরীরে নেই তেমন জোর। মানুষের জমিতে যখন কোন কাজ পায়, তাই করে থাকে। অভাবের মধ্যদিয়ে বিকাশ উচ্চশিক্ষার জন্য ২০১৬ সালে দিনাজপুর সরকারি কলেজে বাংলা বিভাগে ভর্তির সুযোগ পায়। নিজের আশা আর স্বপ্ন পুরন করতে বিকাশ পারিজমায় দিনাজপুরে। অনেক কষ্ট করে বাবা-ভাইয়ের পাঠানো টাকা দিয়ে বিকাশ বর্তমান অনার্স চতুর্থ বর্ষে এসেছে। কিন্তু বর্তমান তার পরিবারের এমন দুর্দিন তাকে আর টাকা পয়সা পাঠাতে পারে না তার বাবা-ভাই। ছোট বোনের লেখাপড়া, বড় বোনের বিয়ে-শাদী, বড় ভাইয়ের স্বল্প বেতন আর দিনমজুর বাবার অল্প কামায়ে চলছে না তাদের সংসারিক খরচ। তাই বাবা-মা, ভাই-বোনের কষ্ট দুর করতে, তাদের মুখে হাসি ফোটাতে আবারও পারিজমায় সুদুর ঢাকা শহরে। ঢাকার সব কিছইু বিকাশের অচেনা,শুধু তার এলাকার রফিকুল ইসলাম নামে বড় ভাইয়ের ঠিকানায় গিয়ে হাজির হয়। বহু চেষ্টা করে কোন চাকরি জোগাড় করতে পারেনি বিকাশ। শেষে রফিকুলের পরামর্শে হাতে তুলে নেয় রিকশা।

বিকাশ জানান, ছোট থেকে সংসারের শত কষ্ট আর অভাব-অনটানের মধ্যদিয়ে আমি লেখাপড়া করে আসছি। ঠিক মত পেট ভরে খেতে পায়নি, দুই থেকে কখনও তিনটি শার্ট-প্যান্ট পায়নি। অভাবের মাঝেই আমরা ভাই-বোন বড় হয়েছি। অনেক কষ্ট করে লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করেছি। বড় ভাই-বোন বেশি লেখাপড়া করতে পারেনি। শত কষ্টের মাঝেও আমি লেখাপড়ার হাল ছাড়িনি। জীবনের ছেড়া কাপড় পড়ে আর না খেয়ে থেকেছি। আমার অনেক আশা আমি লেখাপড়া শেষ করে জীবনে প্রতিষ্ঠীত হবো। ভাই-বোন আর বাবা-মার স্বপ্ন পুরন করবো। দুঃখের বিষয় অনার্স শেষ না হতেই সংসারে দেখা দিচ্ছে অভাবের কালো মেঘ। তাই লেখাপড়া বাদ দিয়ে অভাবের কালো মেঘটাকে দুরে সরাতে ঢাকায় এসেছি একটি চাকরি জন্য। শেষে কোন চাকরি না পেয়ে ৫ থেকে ৬ দিন যাবৎ ঢাকা শহরের অলিগলিসহ প্রধান সড়কে রিকশা চালাচ্ছি। তবে আমার কি আর অভ্যাস আছে রিকশা চালানোর,জীবনে প্রথম রিকশা চালাচ্ছি। এতোদিন মানুষকে রিকশা চালায়তে দেখেছি, আজ আমি নিজেই একজন রিকশায়ালা।

কথা হয় বিকাশের বাবা শ্রী তপন দাসের সাথে, তিনি বলেন, বাবা আমার দুই ছেলে দুই মেয়ে। সংসারে তেমন কোন আয়ের উৎস নেই। নিজের শরীরের ওপর দিয়ে ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছি। কষ্টের কথা কি বলি, ছেলে-মেয়েদের চাহিদা ঠিক মতো কখনও পুরন করতে পারিনি। আমার সন্তানেরা অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করছে। বিকাশ নিজের প্রচেষ্টায় আজ এতোদুর লেখাপড়া করেছে। তার পড়াশুনার জন্য ঠিকমতো পয়সাকড়ি দিতে পারতাম না। ছেলে আমার খেয়ে না খেয়ে বন্ধুদের কাছে বইপত্র চেয়ে লেখাপড়া করে আসছে।

বিকাশের মা বলেন, বিকাশ ঢাকা গিয়েছে, চাকরি করার জন্য। আমার ছেলে অনেক ভাল লেখাপড়া করে, ওর তো ভাল ভাল চাকরি হবে। কয়েকদিন আগে ঢাকায় গিয়েছে। বিকাশের বাবা আগের মতো কামায় করতে পারে না। বিকাশ চাকরি করে টাকা পাঠাবে, তখন আর ওর বাবাকে কাজ করতে হবে না।

বিকাশের দাদা তাপস দাস বলেন, আমরা দু’ভাই দু’বোন। আমি একটা কোম্পানির সেলসম্যান হিসেবে কাজ করি। স্বল্প বেতনে ভাই-বোনদের চাহিদা মেটাতে পারছি না। তাই বিকাশ লেখাপড়া বাদ দিয়ে ঢাকায় চাকরির সন্ধানে গিয়েছে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*