ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড যেসব সমস্যা তৈরি করতে পারে

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পজিটিভ বিডি নিউজ ২৪ ডটকম : ভেবেছিলাম ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়ার অসুবিধা নিয়ে লিখব না। পরে মনে হলো, কেন নয়? সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলে ভবিষ্যতে কী বিপদ হতে পারে তা নিলে লিখছেন। অনেকে পত্রপত্রিকায়ও লিখেছেন। এরই মধ্যে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। যে কথাগুলো বিভিন্ন আলোচনায় এসেছে সেগুলো না লিখলেও যে কথাগুলো আলোচনায় আসেনি, সেগুলো অবশ্যই আইনপ্রণেতাদের গোচরে আনা প্রয়োজন। দুটি কল্প দৃশ্যের উদাহরণ আলোচনা করা যাক।
দৃশ্যকল্প: এক
করিম রহিমকে যেকোনোভাবেই হোক খুন করতে চায়। একজন আরেকজনের প্রতিদ্বন্দ্বী। করিম একজন পেশাদার খুনির সঙ্গে দেখা করল। খুনি কুড়ি লাখ টাকা দাবি করল। করিম দিতে রাজি। কিন্তু খুনি দুই মাস সময় চায়। কারণ, কঠিন ছক কষতে হবে, যাতে খুনও করা যায় আবার খুন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বেঁচেও যায়। করিমের তর সয় না। হঠাৎ মনে পড়ে তারই মহল্লার সন্তানসহ স্বামী পরিত্যক্ত অভাবগ্রস্ত নারীটির কথা। করিম গিয়ে তাকে বোঝাল, সামান্য পরিশ্রমেই সে পাঁচ-সাত লাখ টাকা উপার্জন করতে পারে। শুধুই সামান্য অভিনয়ের দরকার হবে। রহিমকে যৌনকর্মে প্রলুব্ধ করতে পারা অত্যন্ত সহজ। পরিকল্পনা হলো। রহিমও প্রলুব্ধ হলো। যথাসময়ে নারীটি ধর্ষণের শিকার হওয়ার যথার্থ অভিনয়টি করে ফেলল। প্রমাণও মিলল। রহিমের ফাঁসি হলো।
এভাবে একদল মানুষ বহু বিপন্ন নারীকে হাতিয়ার বানিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধি ঘটাতে পারে।
করিমকে রহিমা ভালোবাসে। অনেকটা একতরফা ভালোবাসা। করিম সুযোগ নেয়। করিম রহিমার অনিচ্ছা-অননুমোদনের ধার না ধেরে জোর করে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে রহিমা তার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটায়। তার ইচ্ছা করিমের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করবে। রহিমা চায় তার শাস্তি হোক। প্রয়োজনে যাবজ্জীবন সাজা হোক। কিন্তু সে মামলা করতে পারে না। সে চায় লোকটির সাজা হোক, কিন্তু ফাঁসি হয়ে যাবে, এটা সে ভাবতেই পারে না। সাবেক প্রেমিকের জন্য মনের গভীরে কোথায় যেন খানিকটা মায়া তো আছেই। জানালে করিমের ফাঁসি হয়ে যাবে ভেবে সে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও জানায় না।
জানালে লোকটির ফাঁসি হয়ে যাবে, তারও যে পরিবার-সন্তান-স্বজন আছে। একজনের অপরাধে কতগুলো মানুষ ভুগবে। এ রকম মানবিক ভাবনার দুর্বিপাকে পড়েও অনেক ভিকটিম জানাতেই যাবে না। এভাবে ধর্ষণের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের আরও কমবে। ধর্ষণ আরও বাড়বে।
অনেকে বলবেন, এ সবই কষ্টকল্পনা। কেউ বলবেন, অতিসরলীকরণ। কেউ বলবেন, আইন এত সরলরেখায় চলে না। আইনের কত কত ধারা-উপধারা যে থাকে। তদন্তের কত কী খুঁটিনাটি থাকে প্রভৃতি। এসব এত কিছু আছে বলেই কিন্তু আমাদের দুর্ভাবনাও বেশি। আইনের যত ধারা-উপধারা, তত বেশি ফাঁকফোকর। আমাদের দেশে আরও বেশি ভয়ের কারণ আইন ও বিচারব্যবস্থার পরতে পরতে দুর্নীতি ও দলীয়করণ। ধর্ষক ক্ষমতাসীন দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হলে তাকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা থাকবেই। জেল-জরিমানার বিষয় হলে সে রকম চেষ্টার দরকার হবে না। তাদের আশ্বস্ত করার সুযোগ থাকে যে একটা নির্দিষ্ট সময় জেল খাটার পর তোমাদের শাস্তি কমিয়ে আনা হবে।আইন কড়া করলে কী হয়? সেই উদাহরণ আমাদের সামনেই আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ প্রতিপক্ষকে হেনস্তার কাজে ব্যবহার করা হয়। পুলিশের ভাষ্যমতেই জানা যায়, এসব মামলার ৮০ ভাগেরই কোনো বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায় না। (বিবিসি বাংলা সংবাদ ৩০ জুন, ২০১৮)। ২০১৮ সালের ১৫ হাজার মামলার অভিযোগের ৪ হাজারটির কোনোই সত্যতা মেলেনি। ২০১৭ সালে মাত্র সাড়ে ৭০০-র মতো মামলার বিচার হয়েছে। জামিন-অযোগ্য অপরাধ বিধায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে বা প্রতিশোধ নিতে অনেক নারীকে এসব মিথ্যা মামলায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এই আইনে ৯০ দিনের মধ্যে দ্রুত বিচার করতে হয়। ফলে বিবাদীপক্ষকে চাপের মুখে ফেলে একদল অপরাধী টাকাকড়ি নিয়ে মামলায় আপস-নিষ্পত্তি করে।
অথচ আইনটি কার্যকর করা হয়েছিল নির্যাতন থেকে নারীদের সুরক্ষার জন্য। এই আইনেই তো ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড আছে। ধর্ষণজনিত হত্যা হলে সরাসরি সম্পৃক্ত সবার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান তো রয়েছেই। নারী নির্যাতন (নিবর্তক শাস্তি) অধ্যাদেশ, ১৯৮৩, এবং ১৯৯৫ ও ২০০০ সালের আইনেও শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই ছিল। কিন্তু বিচার সম্পন্নের হার সাড়ে তিন ভাগের মতো। শাস্তির হার এক ভাগেরও নিচে। অর্থাৎ, কড়া আইন তো আছেই। সমস্যা তাহলে কী? সমস্যা আইনের প্রয়োগহীনতা। সেই গলদটির সমাধান না করেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান করতে ঝাঁপিয়ে পড়া নিতান্তই অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও জনতুষ্টিমূলক সিদ্ধান্ত।
যে প্রসঙ্গগুলো অনেকেই ইতিমধ্যে এনেছেন, সেগুলোর অন্যতম—এক, ধর্ষণের পর হত্যা বেড়ে যাবে। ধর্ষক মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে তার শিকারকেই হত্যা করবে। নমুনা ধ্বংস করতে লাশ পোড়ানো, গুম বা বিকৃত করার মতো অপরাধও বাড়বে। দুই, ঘটনাচক্রে আক্রান্ত ব্যক্তি বেঁচে গেলেও ধর্ষক যেভাবেই হোক ভিকটিমকে বাধ্য করবে আদালতে গিয়ে উল্টো জবানবন্দি দিতে। এটা বলতে যে সে ধর্ষণের শিকার হয়নি। এখানেই ক্ষমতা-সম্পর্কের প্রশ্ন চলে আসে। ধর্ষকেরা প্রায়ই ক্ষমতাবান হয়। ভিকটিম তাদের দাপটের কাছে নতি স্বীকার করবে না, এমন সম্ভাবনা কম। বিশেষত আমাদের দেশে আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচার-ব্যবস্থার গিঁটে গিঁটে দুর্নীতি লেপ্টে থাকায় আশ্বস্ত থাকার কোনোই সুযোগ নেই।
আমরা কি এ রকম ভেবে দরজা খুলে রেখে ঘুমাই যে আগে তো চুরি হোক, তারপর বিচার করব? আগে তো দাঁতে ব্যথা হোক, হলেই দাঁত উপড়ে ফেলে দিব—এ রকম ভাবনায় আমরা কি দাঁত পরিষ্কার রাখার চেষ্টাও করি না? শস্যের খেতে কি বেড়া দিই না এই ভেবে, আগে তো ছাগল-গরুতে নষ্ট করুক, তারপর সেগুলোকে তো খোঁয়াড়ে পাঠাবই! ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড মানে ‘আগে তো ধর্ষণ করুক, তারপর তো ফাঁসিতে ঝোলাবই’ ব্যাপার। সুরক্ষার চিন্তা এল না। প্রতিকারের চিন্তা এল না। প্রতিরোধের চিন্তা এল না। এল শুধু প্রতিশোধের চিন্তা। ক্ষতি একবার হয়ে গেলে প্রতিশোধে কী যায়-আসে? যে ধর্ষণের শিকার মানুষটির বাকি জীবনটিই কাটাতে হবে বিভীষিকার মধ্যে, অন্য একজনের ফাঁসিতে তার সাময়িক সন্তুষ্টি ছাড়া আর কীই-বা যাবে-আসবে?
রাগের মাথায় অনেকেই ‘ফাঁসি চাই’ বলছেন বটে। সরকার এই দাবির প্রতি এমনভাবে সাড়া দিচ্ছে যেন তারা জনগণের সব কথাই শোনে-রাখে। সরকার কেন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ-মোর্চা গড়ে তোলে না? সবার হাতে হাতে ফোন আছে। একটি অ্যাপ তৈরি করা যায়, যাতে যে কেউ যে কোনো জায়গায় কাউকে নিগৃহীত হতে দেখলেই অনেকগুলো পুলিশি প্রতিরোধ সেলে যোগাযোগ করতে পারে। সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তি যিনিই মহৎ কাজটি করবেন, তাঁর বা তাঁদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, স্বীকৃতি ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যায়। স্কুল পর্যায়ে স্কুল ব্রিগেড তৈরি করা যায়। ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ে নারীদের সংগঠিত করা যায়। সে জন্য সাহায্য সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষামূলক প্রকল্পের ব্যবস্থা করা যায়। অন্যথায় কঠিন আইনের সুযোগ নিয়ে অনেক নারী অপরাধে জড়াবে। অনেক নারীর জন্য আবেগীয় কারণে অভিযোগ দায়েরের রাস্তাটিও বন্ধ হয়ে যাবে।
আমাদের সবার সুমতি হোক। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠুক।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*