ফুল পরিচিতি পর্ব-৪

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাশফুল:

কাশফুল একধরনের ঘাসজাতীয় জলজ উদ্ভিদ।এর বৈজ্ঞানিক নাম Saccharum spontaneum হিন্দি নাম काँस kām̥s, ওড়িয়া:କାଶତଣ୍ଡି kāśataṇḍi অসমীয়া: কঁহুৱা, খাগৰী kahuwa, khagori)। এরা উচ্চতায় সাধারনত ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। নদীর তীরে ফুলফোটা শ্বেতশুভ্র কাশবন দেখতে খুবই সুন্দর।

বর্ণনা:

কাশফুল মূলত ছন গোত্রীয় এক ধরনের ঘাস। নদীর ধার,জলাভূমি,চরাঞ্চল, শুকনো রুক্ষ এলাকা, পাহাড় কিংবা গ্রামের কোনো উঁচু জায়গায় কাশের ঝাড় বেড়ে ওঠে। তবে নদীর তীরেই এদের বেশি জন্মাতে দেখা যায়। এর কারণ হল নদীর তীরে পলিমাটির আস্তর থাকে এবং এই মাটিতে কাশের মূল সহজে সম্প্রসারিত হতে পারে। শরত ঋতুতে সাদা ধবধবে কাশফুল ফোঁটে। বাংলাদেরশর সব অঞ্চলেই কাশফুল দেখতে পাওয়া যায়। কাশফুল পালকের মতো নরম এবং রঙ ধবদবে সাদা। গাছটির চিরল পাতার দুই পাশ খুবই ধারালো।

ব্যবহার:

কাশফুলের বেশ কিছু ঔষধি গুণ রয়েছে। যেমন- পিত্তথলিতে পাথর হলে নিয়মিত গাছের মূলসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে ওষুধ তৈরি করে পান করলে পিত্তথলির পাথর দূর হয়। কাশমূল বেটে চন্দনের মতো নিয়মিত গায়ে মাখলে গায়ের দুর্গন্ধ দূর হয়। এছাড়াও শরীরে ব্যথানাশক ফোঁড়ার চিকিৎসায় কাশের মূল ব্যবহৃত হয়।

সাহিত্য মাধ্যমে:

সাহিত্যে কাশফুলের কথা এসেছে নানাভাবে। রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন গ্রন্থ ‘কুশজাতক’ কাহিনী অবলম্বন করে ‘শাপমোচন’ নৃত্যনাট্য রচনা করেছেন। কাশফুল মনের কালিমা দূর করে। শুভ্রতা অর্থে ভয় দূর করে শান্তির বার্তা বয়ে আনে। শুভ কাজে কাশফুলের পাতা বা ফুল ব্যবহার করা হয়।

অন্যান্য তথ্য:

প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে বাংলাদেশ ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কাশফুল ছিল। কাশফুলের অন্য একটি প্রজাতির নাম কুশ। এরা দেখতে প্রায় কাশফুলের মতোই। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ  পুরাণ-এ কুশের স্থান খুব উঁচুতে। গ্রামের বাড়ি বা পুকুর পাড়ে ইচ্ছা করলে কাশফুল লাগান যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে কিছুটা ঠাণ্ডা ও বালু মিশ্রিত স্থান বেছে নিতে হবে।


কচুরিপানা ফুল:

Related image

কচুরিপানা সাতটি প্রজাতি আছে এবং এরা মিলে আইকরনিয়া গণটি গঠন করেছে। কচুরিপানা মুক্তভাবে ভাসমান বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ । এর আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা পুরু, চকচকে এবং ডিম্বাকৃতির পাতাবিশিষ্ট কচুরিপানা পানির উপরিপৃষ্ঠের ওপর ১ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর কান্ড থেকে দীর্ঘ, তন্তুময়, বহুধাবিভক্ত

মূল বের হয়, যার রং বেগুনি-কালো। একটি পুষ্পবৃন্ত থেকে ৮-১৫ টি আকর্ষণীয় ৬ পাঁপড়ি বিশিষ্ট ফুলের থোকা তৈরি হয়।

কচুরিপানা খুবই দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। এটি প্রচুর পরিমাণে বীজ তৈরি করে যা ৩০ বছর পরও অঙ্কুরোদগম ঘটাতে পারে। সবচেয়ে পরিচিত কচুরিপানা Eichhornia crassipes রাতারাতি বংশবৃদ্ধি করে এবং প্রায় দু’ সপ্তাহে দ্বিগুণ হয়ে যায়।

কচুরিপানা দক্ষিণ পাকিস্তানের সিন্ধের প্রাদেশিক ফুল।

বাংলায় কচুরিপানার আগমনের ইতিহাস

ধারণা করা হয় কচুরিপানার অর্কিড-সদৃশ ফুলের সৌন্দর্যপ্রেমিক এক ব্রাজিলীয় পর্যটক ১৮শ’ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলায় কচুরিপানা নিয়ে আসেন। তারপর তা এত দ্রুত বাড়তে থাকে যে ১৯২০ সালের মধ্যে বাংলার প্রায় প্রতিটি জলাশয় কচুরিপানায় ভরে যায়। নদ-নদীতে চলাচল দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে আর জলাভূমির ফসল আমন ধান আর পাট চাষ অসম্ভব হয়ে পড়ে, ফলে বাংলার অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দেয়।

এমত পরিস্থিতিতে সরকার কচুরিপানার দৌরাত্ম্য হ্রাসে বাংলার জলাভূ

মি আইন, বাংলার মিউনিসিপ্যালিটি আইন, বাংলার স্থানীয় সরকার আইন এবং বাংলার স্থানীয় গ্রাম সরকার আইন সংশোধন করে। ১৯৩৬ সালে কচুরিপানা আইন জারি করা হয়, যার মাধ্যমে বাড়ির আশেপাশে কচুরিপানা রাখা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত কচুরিপানা পরিষ্কার অভিযানে অংশ নেয়াকে নাগরিক কর্তব্য ঘোষণা করা হয়। আক্রান্ত এলাকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের নিজ নিজ এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে কচুরিপানা দমনে কার্যকর অভিযান চালতে আদিষ্ট হন।

জনতা এই কাজে উৎসাহের সাথে যোগ দেয়। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে সবগুলো দলের নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাকে কচুরিপানার অভিশাপ-মুক্ত করার অঙ্গীকার ছিল। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক নির্বাচনে বিজয় লাভ করে তার নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং কচুরিপানার বিরুদ্ধে জোরদার অভিযান চালান।

কচুরিপানার বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের সাফল্য লাভের আরে

কটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল সার হিসেবে পঁচানো কচুরিপানার উৎকৃষ্টতা। এই গুণের কারণে ভূমিহীন কৃষকরা কচুরিপানা জমিয়ে ভাসমান কৃষিজমি তৈরি করতে শুরু করে। অবশেষে ১৯৪৭ এর মধ্যে বাংলার জলাশয়গুলো কচুরিপানা-বদ্ধতা থেকে মুক্তি লাভে সক্ষম হয়। তবে এখনও বাংলার জলাশয়ে কচুরিপানা বহাল তবিয়তেই আছে।

কচুরিপানা এখন প্রধানত সার হিসেবেই অধিক ব্যবহূত হয় এবং বর্ষাকালে বন্যা আক্রান্ত অঞ্চলে গবাদি পশুর খাদ্য যোগায়। এছাড়া হাওর অঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় বাঁশ দিয়ে আটকে রেখে ঢেউয়ের আঘাত থেকে ভিটে-মাটি রক্ষায় ব্যবহূত হয়।


রজনীগন্ধা ফুল:

Image result for রজনীগন্ধা ফুল জীবন

রজনীগন্ধা Amaryllidaceae পরিবারের সদস্য। এর ইংরেজী নাম Tuberose এবং বৈজ্ঞানিক নাম Polianthes tuberosa. এ ফুলের আদি বাসস্থান মেক্সিকো। ফুলদানীতে এ ফুল ৭-১০ দিন সজীব থাকে এবং প্রতি রাতেই সুগন্ধ ছড়িয়ে ঘরের পরিবেশকে বিমোহিত করে।বাংলাদেশে এ ফুলের উত্তরোত্তর চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে এর যথেষ্ট চাষাবাদ হচ্ছে।

রজনীগন্ধা ফুল ভালোবাসেননা এমন লোক মনে হয় খুঁজে পাওয়া যাবেনা।সাদা রঙের মনোমুগ্ধকর এ ফুল সর্বত্রই জনপ্রিয়।এর রয়েছে প্রাণমাতানো সুবাস।বিভিন্ন উৎসব,অনুষ্ঠানে রজনীগন্ধা ফুলের রয়েছে ব্যাপক কদর।প্রিয়জনকে একটি সুন্দর ফুলের তোড়া উপহার দিতে চান?রজনীগন্ধা ফুল ছাড়া সেই ফুলের তোড়া অসম্পূর্ণই মনে হবে।সারা দেশে এবং সারা বছরই এর চাহিদা থাকায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে রজনীগন্ধা ফুল।পাঠকদের জন্য দেয়া হলো সুন্দর একটি রজনীগন্ধা ফুলের ছবি।

ব্যবহার: শুষ্ক, রুক্ষ ত্বকে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে রজনীগন্ধা। পূর্ণস্ফুটিত রজনীগন্ধা ফুলের পাঁপড়ি বেটে নিন। এর সাথে সামান্য মাখন ও মধু মিশিয়ে ত্বকে ম্যাসাজ করুন। ২০ মিনিট পর ঠাণ্ডা পানিতে ধুয়ে ফেলুন।


মোরগঝুঁটি ফুল:

Image result for মোরগঝুঁটি  ফুল

মোরগফুল (বৈজ্ঞানিক নাম Celosia argentea var. cristata) Amaranthaceae পরিবারের ক্রান্তীয় এশিয়ার জাত হলেও এটি বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। মোরগফুলকে মোরগঝুঁটি এবং লালমুর্গা নামেও ডাকা হয়। এই ফুলের মঞ্জরিটি দেখতে মোরগের মাথার ঝুঁটির মতো বলেই এর নাম হয়েছে মোরগঝুঁটি ফুল্

বিবরণ:

মোরগ ফুল সচরাচর গ্রাম-গঞ্জের আঙিনায়, বসতবাড়ির উঠোনের পাশে, রাস্তার ধারে বিভিন্ন জায়গায় ফুটে থাকে। প্রজাতি ভেদে গাছের পাতা, শাখা-প্রশাখা ও ফুলের রং ভিন্ন হয়। লাল, কমলা, হলুদ, সাদা, সোনালী ও মিশ্ররঙের মোরগফুল দেখতে পাওয়া যায়। ফুল গন্ধহীন, উজ্বল রঙের মোলায়েম পালকের মতো। পরিপক্ব ফুলের মাঝে ডাঁটা বীজের মতো বীজ হয়। ফুলের গুচ্ছাকার তন্তুর মধ্যে বীজ থাকে। বীজ অত্যন্ত ক্ষুদ্য। দেখতে একেবারে লাল শাকের বীজের মত। বীজের রং কালচে বাদামি। ৪-৫ টা মোরগফুলের বীজ একত্রিত করলে একটা সরিষা দানার সমান হবে। এর পাতা বেশ লম্বা, শিরা ও মধ্য শিরা স্পষ্ট, অগ্রভাগ সূচালো। গাছ উচ্চতায় ৪-৭ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। গাছের কান্ড হতে শাখা-প্রশাখা বের হয়। শাখা-প্রশাখা ও কান্ড বেশ নরম। সারা গাছে ফুল ফুটে তবে কান্ডের ঠিক অগ্রভাগে মোরগ ঝুটি আকৃতির বড় ফুলটি ফুটে এবং শাখা-প্রশাখার ফুলগুলি আকারে ছোট আকৃতির হয়। মোরগফুল বর্ষজীবি গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এর কান্ড নরম ও রসালো হয়ে থাকে। কান্ড ২-৩ ইঞ্চি মোটা হয় এবং এর গায়ে অসংখ্য গিঁঠ থাকে। মোরগফুলের পাতা লম্বাটে, বর্শাফলাকৃতির। পাতার রং হলদেটে সবুজ এবং মাঝখানে লালচে ছোপ থাকে। গাছের প্রতিটি গিঁঠ থেকে গুচ্ছ আকারে পাতা গজায়। প্রতিটি গুচ্ছে থাকে ৩-৪ টা পাতা। এদের একটা পাতা বেশ বড় হলেও বাকি পাতা গুলো হয় খুব ছোট। বড় পাতার দৈর্ঘ্য গড়ে ৫ ইঞ্চি ও প্রস্থ ১-১.৫ হয়ে থাকে। ছোট পাতা ১-১.৫ ইঞ্চি লম্বা হয়। এ ফুলের পাঁপড়ি ও ফল হয়না।

মৌসুম

মোরগফুল মূলত হেমন্ত ঋতুর ফুল। মে মাসে বীজ বপন করার পর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে গাছে ফুল ধরে এবং ফুল ফুটন্ত গাছ মার্চ মাস পর্যন্ত টিকে থাকে। তারপর ফুলগাছ আপনাআপনি মরে যায়। রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশ, নিষ্কাশিত ও প্রায় সব ধরনের মাটিতে এ ফুলগাছ জন্মে। ইদানিং বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও এ ফুলের চাষ করা হয়।

ভেষজ গুনাগুন

মোরগ ফুলের অনেক ভেষজ গুনাগুণ রয়েছে। অতিরিক্ত প্রস্রাব উপশমে এবং আমাশয় রোগের চিকিৎসায় মোরগ ফুল ব্যবহার হয়ে থাকে।


Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*