ভাইরাল ঢামেক মেধাবী ছাত্র রাজকুমারের বাড়ি পরিদর্শন করলেন প্রশাসন

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আব্দুর রাজ্জাক, বিশেষ প্রতিনিধি– সম্প্রতি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক সময়কার মেধাবী ছাত্র রাজকুমার শীলের বাড়ি আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলমের নির্দেশক্রমে বিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান, থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুজ্জামান ও বিরামপুর উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ শিশির কুমার সরকার পরিদর্শন করেন।

জানা যায়, তাঁর পরিবারকে ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ ২ প্রকল্প থেকে বসতবাড়ী প্রদান করা হয়েছে যা গত অর্থবছরে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আজ জেলা প্রশাসকের নির্দেশক্রমে রাজকুমার শীলের পরিবারের চাহিদা মোতাবেক দুই ছেলেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে, যা আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রসঙ্গত, সে ছিলেন একজন ঢাকা মেডিকেল ও ঢাকা বোর্ডের শীর্ষ মেধাবী ছাত্র রাজকুমার। এখন সে ৫০ টাকার দিনমজুর। রাজকুমার দিনাজপুর জেলার বিরামপুর পৌর এলাকা ঘাটপাড়ের নাপিত শ্রী লগীনার ছেলে রাজকুমার শীল।

রাজকুমার নামের সাথে চেহারাও যেন রাজকুমারের মত। ১৯৮০ সালে বিরামপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। তারপর ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসিতে ঢাকা বোর্ড থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সম্মিলিত মেধাতালিকায় পেয়েছিলেন উচ্চতম স্থান। যথারীতি সুযোগ পেয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তিনি মেধাবীদের মধ্যে মেধাবী। কিন্তু স্বাস্থ্য বিড়ম্বনায় আজ মাত্র ৫০ টাকার দিনমজুর। এ অবিশ্বাস্য মনে হলে সত্যিই অদম্য অসম্ভব মেধাবীর সত্যি জীবন কাহিনি।

দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় ফার্মাকোলজিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন রাজকুমার শীল। তারপর মানসিক রোগের রোগী। পাননি সঠিক চিকিৎসা। আজ তাই এই হাল তার। আজ তার নামের আগে ডাক্তার সহ নাম হত ডা. রাজকুমার শীল। হতে পারতেন উপমহাদেশের খ্যাতনামা চিকিৎসক। কিন্তু কাজ করছেন এক ভুষি কারখানায়। ঢামেক কে-৪০ ব্যাচের এ শিক্ষার্থী।

রাজ কুমার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কে-৪০ (k-40) ব্যাচের বলে ডিএমসি’র চিকিৎসকরা আইডেন্টিফাই করেছেন।

বিরামপুর উপজেলা হাসপাতালের কয়েক জন ডাক্তার জানায়, সময়:আনুমানিক দুপুর ১ টা বেজে ৪৫ মিনিট। স্থান:বহিঃবিভাগ, বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, দিনাজপুর। আমরা কয়েকজন মেডিকেল অফিসার ডিউটি রুমে ছিলাম। রোগী আসা প্রায় শেষের দিকে। এমন সময় প্রায় ৭০ বছর বয়সী একজন মহিলা আসলেন। সাথে ৪৮ আর ৫২ বছর বয়সের দুজন ছেলে। কি সমস্যা জিজ্ঞেস করাতে হাতের কাগজ গুলো এগিয়ে দিয়ে বললেন, প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য দরখাস্ত করবেন ছেলের জন্য। অনেক কাগজের সাথে পাবনা মানসিক হাসপাতালের দুইটি ছাড়পত্র পেলাম। প্রথমে বুঝতেই পারছিলাম না, কোন ছেলে রোগী।

পরে ভদ্রমহিলা বুঝিয়ে বললেন, তার দুই ছেলের জন্যই দরখাস্ত করবেন। দুইজনেরই একই অসুখ।দুইজনের মধ্যে একজনের ন্যাশনাল আইডি কার্ড এর সই দেখে, কিছুটা আশ্চর্য হলাম। নাম লেখা রাজকুমার শীল। হাতের লেখাটা কেন যেন তার চেহারার সাথে মিলছেনা। সুন্দর লেখা। জিজ্ঞাসা করলাম,আপনি কতদুর পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন। বললেন- ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলাম। নিজের কান কে বিশ্বাস হচ্ছে না। একে একে উনার সব কিছু বললেন। ডিএমসির কে-৪০ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন।

ঢাকা কলেজ শেষে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলেন। দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় ফার্মাকোলজি তে ফেল করে পরে কয়েকবার পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তারপর মানসিক অসুস্থতার (সিজোফ্রেনিয়া) জন্য বাড়ী থেকে নিরুদ্দেশ ছিলেন ১৪/১৫ বছর। সে সময় একটি কারখানায় কাজ করতেন। ১ বছরের মত পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তিও ছিলেন। প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তিও পেয়েছিলেন, বললেন তার মা। কথা বার্তায় ও বেশ প্রকৃতস্থ মনে হলে।নিয়মিত ওষুধ খেয়ে এখন আগের তুলনায় বেশ ভাল আছেন বলে জানালেন।

মেডিকেলের পড়াশোনার ও কিছু বিষয় উনার এখনো মনে আছে। বাবা পেশায় নাপিত হলে ও চারজন ছেলের একজন বাদে কাউকেই সেই পেশায় আসতে দেননি। আরেক ছেলেকে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন।

বর্তমানে তিনি একটি ভুষির কারখানায় কাজ করেন। কোনদিন ১০/২০ কোনদিন ৩০ টাকা মজুরি পান।

অনুমতি নিয়ে এক সময়ের এই মেধাবী মানুষটির ছবি তুললাম। K-4০ ব্যাচের আমার শ্রদ্ধেয় একজন স্যারের ছবি দেখিয়ে বললাম চিনতে পারেন কিনা? মাথা দোলালেন। হয়ত কিছুটা চিনতে পেরেছেন। মনে করার চেষ্টা করলেন। উনার মা ও ছেলের ক্লাসমেট এর ছবি দেখলেন।আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন।

কে জানে, সুস্থ থাকলে হয়ত এই রাজকুমার শীল হয়ে উঠতেন স্বনামধন্য ডা.রাজকুমার শীল।একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত এবং আর্থিকভাবে অসহায় মেধাবী ছাত্রের এমন পরিণতি মেনে নেয়ার মত নয়।

এক রত্নগর্ভা মায়ের করুণ আকুতি- তাঁর মা পার্বতী রাণী শীল জানিয়েছেন, প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছিল রাজকুমার। অসুস্থতার পর বর্তমানে সে কথাবার্তায় কিছুটা স্বাভাবিক। নিয়মিত ওষুধ খেয়ে আগের তুলনায় অনেকটা ভালো।

রাজকুমারের বাবা পেশায় নাপিত হলেও চার ছেলের একজন বাদে কাউকেই সেই পেশায় আসতে দেননি। তার আরও দুই ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন।

রাজকুমারের আরেক ভাই একই রোগে আক্রান্ত। রাজধানীর তিতুমীর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় স্নাতক সম্পন্ন করতে পারেননি তিনি।

রাজকুমার বর্তমানে একটি ভুষি কারখানায় কাজ করেন। দিন শেষে ৩০-৫০ টাকা মজুরি পান। আর এভাবেই চলছে এ মেধাবী মানুষটির জীবন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*