হিলি রায়ভাগ : পুলিশ-মাদক ব্যবসায়ির মারামারির ঘটনায় আসামী ছাত্র কৃষকসহ নিরীহ লোকেরা !

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোসলেম উদ্দিন,  বিশেষ প্রতিনিধি : দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) উপজেলার রায়ভাগ গ্রামে পুলিশের মাদক মামলায় বাড়ী-ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রামের অর্ধশত মানুষেরা। এদের মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাড়াও কৃষক, ব্যবসায়ি ও নিরীহ লোকজন আছেন। এরফলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী গ্রামটি পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় এমন ঘটনা অমানবিক বলে গ্রামের লোকজনেরা জানিয়েছেন।

গ্রামবাসীরা জানান, একজন মাদক ব্যবসায়ির কাছ থেকে পুলিশ সদস্যের ফ্রিতে ফেন্সিডিল খাওয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশ-মাদক ব্যবসায়ির মধ্যে মারপিটের ঘটনা ঘটে। আর এই ঘটনায় মামলা দায়ের করে পুলিশ নিরিহ গ্রামবাসীর নামেও।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে রায়ভাগ গ্রামে সরেজমিন গেলে গ্রামবাসীরা জানান, সাহেব মিয়া অন্য এক মাদকসেবীকে সঙ্গে নিয়ে রায়ভাগ গ্রামে এসে রাজু নামে এক মাদক কারবারির কাছে ২ বোতল ফেনসিডিল নিয়ে সেবন করেন। এরপর ৫ বোতল ফেনসিডিল আনতে বললে সে আরও ২ বোতল এনে তাদের দেয়। এসময় খাওয়া শেষ হলে রাজু টাকা চাইলে তারা টাকা দিতে অস্বীকার করে। এনিয়ে তাদের মধ্যে বাক-বিতন্ডা শুরু হলে রাজুকে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য টানাহেঁচড়া করেন। একপর্যায়ে সাহেব মিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে রাজুকে বিবস্ত্র করে মারপিট করতে থাকলে পাশের মাঠ থেকে ঘটনাটি দেখে ক্রিকেট খেলারত যুবকরা দৌঁড়ে এসে থামানোর চেষ্টা করেন। এ অবস্থায় খবর পেয়ে থানা পুলিশের অন্যান্য সদস্যরা এসে গ্রামবাসীর উপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ করতে থাকেন। এতে পুলিশের তান্ডবে গ্রামবাসীরা দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক পালিয়ে যান। এমনকি পুলিশ গুলি করারও হুমকি দেন।

গ্রামের লোকজনেরা জানান, মামলার ১৯ জন আসামীর মধ্যে ১০নং আসামী আবিদ হাসান (১৪) স্থানিয় গোহাড়া দ্বিমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে, ১৩নং আসামী তুহিন (২২) ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৬নং আসামী মোকাররম হোসেন (২০) রাজশাহী পলিটেকনিক্যাল কলেজে এবং ১৯নং আসামী নাইম হাসান (১৭) এবার এসএসসি পাশ করে অন্যত্র লেখাপড়া করছে।

গ্রামের বাসিন্দা মোফাজ্জল হোসেন জানান, আমার ছেলে রাজশাহী পলিটেকনিক্যাল কলেজে মেকানিক্যাল বিষয় নিয়ে লেখাপড়া করছে। করোনা ভাইরাসের কারণে বাড়ীতে এসেছে। ওইদিন সে মাঠে গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিল। সে এব্যাপারে কিছুই জানে না। তাকেও আসামী করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও এখন সে পুলিশের ভয়ে বাড়ী ছেড়ে পালিয়ে আছে।

মামুনুর রশিদের স্ত্রী জানান, ছোট ভাইকে পিটাতে দেখে বাঁচাতে যায় আমার স্বামী মামুনুর। এসময় পুলিশ তাকেও উলঙ্গ করে মারপিট করে। পরে তাকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। রাতে শুনি আমার স্বামীকে ৭০টি ইয়াবা দিয়ে মামলা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ নির্যাতন করে মারল আবার উল্টো ইয়াবার মিথ্যা মামলা দিয়ে চালান দিল এটা কোন জুলুম। বাপের প্রতি নির্যাতন ও অন্যায় দেখে আমার ছোট ছেলে ভয়ে বাড়ীতে থাকে না। সে ‘এ বাড়ী ও বাড়ী’ পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

গ্রামবাসি ও মামলার আসামী বিপ্লব জানান, আমি মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বাড়ীতে এসে খাওয়া করে বসে আছি। এসময় পুলিশ এসে কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে ধরে নিয়ে যায়। কোথায় মারামারি কি ঘটনা আমি এব্যাপারে কিছুই জানি না। আমাকে থানায় নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। এসময় তিনি হাতে ও পায়ে আঘাতের দাগ দেখিয়ে বলেন আমাকে ৯০০ গ্রাম গাঁজা দিয়ে চালান দেওয়া হয়েছে।

১ নং খট্রামাধাবপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোকলেছার রহমান জানান, ঘটনাটি আমি শুনেছি । কনস্টেবল সাহেব মিয়া নাকি অন্য এক মাদকসেবীকে সঙ্গে নিয়ে ওই গ্রামে গিয়ে রাজু নামে এক মাদক কারবারির কাছে ২ বোতল ফেনসিডিল নিয়ে সেবন করেন। এরপর ৫ বোতল ফেনসিডিল আনতে বললে সে আরও ২ বোতল এনে তাদের দেয়। এসময় খাওয়া শেষ হলে রাজু টাকা চাইলে তারা টাকা দিতে অস্বীকার করে। এনিয়ে তাদের মধ্যে বাক-বিতন্ডা শুরু হলে রাজুকে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য টানাহেঁচড়া করেন। পরে পুলিশ বাদী হয়ে কয়েকজনের নামে মামলা দিয়েছে।

হাকিমপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুর রাজ্জাক আকন্দ জানান, ওইদিন বেলা ১১ টার দিকে রায়ভাগ গ্রামে থানার কনস্টেবল সাহেব মিয়া ৭০ পিচ ইয়াবাসহ মামুনুর রশিদ নামের একজন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেন। এসময় অন্য মাদক ব্যবসায়ীরা রাজু ছিনিয়ে নেয়। পরে আরো পুলিশ গিয়ে মাদকসহ ৬ জন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আদালতে পাঠানো হয়। তবে কোন নীরিহ ব্যক্তির নামে যদি মামলা হয়ে থাকে তদন্ত করে মামলা থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হবে।

প্রসঙ্গত : দায়েরকৃত মামলার বাদী থানার এসআই একরামুল হক মামলায় উল্লেখ করেন, গত ১১ এপ্রিল বেলা সাড়ে ১২টার দিকে রায়ভাগ গ্রামে মাদক বেচা-কেনার খবর পেয়ে সেখানে যায় পুলিশ। এসময় দুইজন মাদক ব্যবসায়ি মাদক কেনা-বেচা করছে। এসময় পুলিশ মামুনুর রশিদ ও রাজুকে আটক করলে তাদের চিৎকারে তাদের আত্মীয়-স্বজনেরা ঘটনাস্থলে এসে কনস্টেবল সাহেব মিয়াকে রাজু সহ ২০-২৫ জন লোক বেধড়ক মারপিট করে এবং রাজু একটি ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যায়। এসময় মামুনের দেহ তল্লাশী করে লুঙ্গির নীচে থাকা ৭০টি ইয়াবা উদ্ধার করি এবং রাজুর ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে ২০ বোতল এমকেডিল উদ্ধার করা হয়। আটক আসামী রাজুকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করা ও সরকারী কাজে বাঁধা দেওয়ার অভিযোগে অন্যান্য আসামীদের গ্রেপ্তারে তাদের বাড়ীতে তল্লাশী করতে গেলে বিপ্লব হোসেনকে তার বাড়ী থেকে ৯০০ গ্রাম গাঁজাসহ আরও ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় ১৯ জনকে নামীয় ও আরও ১০/১৫ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে তাদের বিরুদ্ধে মাদক, সরকারী কাজে বাঁধা দেওয়ার অভিযোগে থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলা নং ৬, তাং ১১/০৪/২০২০ইং।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*